স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস। কিভাবে আমেরিকায় গড়ে উঠলো এই মূর্তি

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক হার্বার এর তীরে অবস্থিত ৩০৫ ফিট ৬ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট স্ট্যাচু অফ লিবার্টির কথা আজ কে না জানে। ১৮৮৬ সালে তৈরি এমন এক স্থাপত্য কলা সত্যিই বড় আশ্চর্যের। যুক্তরাষ্ট্রের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এমন এক অবাক করা স্থাপত্যকর্ম জানান দেয় শিল্পীর শিল্পচেতনা ও কঠোর পরিশ্রমকে।

বর্তমানে সারাবিশ্বে এটিকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নামের চিনলেও এর প্রকৃত নাম লিবার্টি এনলাইটনেনিং দ্যা ওয়ার্ল্ড। মার্কিন জাতীয়তাবোধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মূর্তিটি। বহু ব্যক্তিত্বের নিরলস পরিশ্রমের ফলে গড়ে ওঠে এমন এক অভূতপূর্ব ভাস্কর্য। মূর্তি তৈরির পেছনে রয়েছে বহু ইতিহাস। মূর্তিটি সম্পর্কে অনেকেই জেনে থাকলেও মূর্তি তৈরির পিছনের ইতিহাস অনেকেরই অজানা।

ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে মার্কিনদের দেওয়া একটি উপহার ছিল স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। আমেরিকান বিপ্লবের সময়কালে অর্থাৎ ১৭৬৫ থেকে  ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের হাত থেকে আমেরিকাকে স্বাধীনতা লাভের সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। তারই স্মৃতি স্বরুপ আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নির্মিত হয় স্ট্যাচু অফ লিবার্টি

আরও পড়ুন- ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা সৃষ্টির ইতিহাস

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস

কিভাবে তৈরি হলো স্ট্যাচু অফ লিবার্টিস্ট্যাচু অফ লিবার্টির নকশা ?

স্ট্যাচু অফ লিবার্টির তৈরি করেছিলেন ফ্রান্স নিবাসী ফ্রেডরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো তিনি কখনই এটি আমেরিকার স্থাপনের কথা চিন্তা করে তৈরি করেননি। ১৮৫৫ সালে মিশর ভ্রমণ এ যান ২০ বছর বয়সি বার্থোল্ডি। সেখানকার স্থাপত্যকর্ম, পরিবেশ তাকে ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং এখান থেকে সূত্রপাত তার মূর্তি তৈরি ভাবনাটি। তিনিও চয়ে ছিলেন তার নির্মিত স্থাপত্য এখানে রেখে যেতে।

বার্থোল্ডি জানতে পারেন ভুমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝে সংযোগ সৃষ্টিকারী সুয়েজ খালের কথা। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এর উপরেই তার স্থাপত্যের বাস্তব রূপ দানের। সুয়েজ খাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে ফেলেন মূর্তি নির্মাণের কথা। মূর্তির নাম দেন ইজিপ্ট বৃঙ্গিং লাইট টু এশিয়া। দুর্ভাগ্যবশত রাজনৈতিক ও নির্মাণ সংক্রান্ত জটিলতার জন্য তা বন্ধ হয়ে যায়। নকশা অনুযায়ী মূর্তি নির্মাণে ব্যয় ছিল প্রায় ৬ লক্ষ মার্কিন ডলার যা ব্যয় করা মিশরের পক্ষে ছিল একেবারেই অসম্ভব।

হার না মানা বার্থোল্ডি এরপর ১৮৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে লস অ্যাঞ্জেলস সর্বত্র ঘুরে বেড়ান তার নকশাটি নিয়ে। এমন সময় ফরাসি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এডওয়ার্ড ডে ল্যাবুলের  কথা জানতে পারেন তিনি। যিনি আমেরিকা ও ফ্রান্সের সম্মিলিত একটি স্মৃতিফলক তৈরি করার প্রকল্প করছিলেন। সেখানেই ভাগ্য খুলে যায় বার্থোল্ডির।

১৮৭৫ সালে ল্যাবুলে ফ্রাঙ্কো আমেরিকান ইউনিয়ন গঠনের মাধ্যমে ২ লক্ষ ৭৬ হাজার মার্কিন ডলার তুলে দেন বার্থোল্ডির হাতে। গুস্তাভে আইফেল যিনি আইফেল টাওয়ারের নকশা তৈরি করেন তার সাথে পরামর্শ করে এর গঠন ও আকার ঠিক করা হয়।

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণে অর্থ কিন্তু এত সহজে আসেনি। ১৮৮০ সালে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছোট ছোট মডেল বিক্রি করা হয়েছিল অর্থ সাহায্যের জন্য। একদম ছোট ৬ ইঞ্চির মডেল বিক্রি হতো ১ ডলারে এবং সবচেয়ে বড় এক ফুটের মডেলগুলি বিক্রি হতো ৫ ডলারে। এরপর নিউইয়র্ক পত্রিকার সম্পাদক জোসেফ পুলিৎজার এর শেষ চেষ্টায় সমস্ত বাঁধাই সরে যায় মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে। পত্রিকায় প্রকাশিত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির প্রতিবেদন প্রতিটি আমারিকেনকে তাদের মূল্যবান অর্থ খরচে আগ্রহী করে তোলে।

এরপর ১৮৮৫ সালে ফ্রান্স ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ৩৫০ টি অংশ নিউ ইয়র্কে পৌঁছায়। দীর্ঘ ১ বছর ধরে এটি তৈরি হওয়ার পর অবশেষে ২৮শে অক্টোবর ১৮৮৬ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে জয় করে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বার্থোল্ডি নির্মিত স্ট্যাচু অফ লিবার্টি যা আমেরিকার গৌরবময় স্থাপত্য হয়ে থাকবে চিরকাল।

Leave a Reply