মাউন্ট রাশমোর নির্মাণের ইতিহাস। কে তৈরি করেছিলেন? কাদের মূর্তি?

মাউন্ট রাশমোর নির্মাণের ইতিহাস। কে তৈরি করেছিলেন? কাদের মূর্তি?

মাউন্ট রাশমোর নির্মাণের ইতিহাস: বিশ্বের বৃহত্তম দেশ আমেরিকা নানা কলাকৃতি এবং সংস্কৃতির জন্যও বহু প্রসিদ্ধ। আমেরিকা বেশ কিছু মহান ব্যক্তিদের মাতৃভূমি যাদের জন্য আমেরিকা গৌরবান্বিত হয়েছে। যাদের মধ্যে অন্যতম নাম গুলি হল জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, থিওডোর রুজভেল্ট, এবং আব্রাহাম লিংকন। এই চারজন মহান ব্যক্তির সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমেরিকাতে মাউন্ট রাশমোর ন্যশনাল মেমোরিয়াল নির্মাণ করা হয়। যার মধ্যে এই চারজন মহান ব্যক্তির মূর্তি বানানো হয়েছে। 

মাউন্ট রাশমোর এর নাম ১৮৮৫ সালের নিউ ইয়র্কের প্রসিদ্ধ উকিল চার্লস এডওয়ার্ড রাশমোরের নামানুকরনে করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ ডোয়েন রবিনসন দক্ষিণ ডাকোটার ব্ল্যাক হিলস্-এ পর্যটকের সংখ্যা বাড়াতে চাইছিলেন। যে কারণে তিনি মহান ব্যক্তিদের মূর্তি বানানোর প্রস্তাব করেন। তিনি ব্ল্যাক হিলস কিছু প্রধান মহান ব্যক্তির মূর্তি বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর এই স্বপ্ন পূরণের জন্য তার প্রয়োজন ছিল একজন খ্যাতনামা মুর্তি শিল্পী। তাই তিনি প্রসিদ্ধ মূর্তি নির্মাতা গুটজন বোরগ্লুম এর সাথে যোগাযোগ করেন। ওই সময় গুটজন জর্জিয়ায় স্টোন মাউনটেন নির্মাণের কাজ করছিলেন। 

আরও পড়ুন :- স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস। কিভাবে আমেরিকায় গড়ে উঠলো এই মূর্তি

মাউন্ট রাশমোর নির্মাণের ইতিহাস

সেই সময়ে গুটজন বোরগ্লুম ডোয়েন রবিনসনক এর সাথে দেখা করতে রাজি হলেন। উনি ভেবেছিলেন যে ওই পাহাড়ে স্মৃতিসৌধ রাষ্ট্রীয় মাহাত্ম্যকে লক্ষ্য করে বানাতে হবে। যাতে তা আমাদের দেশের ইতিহাসকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তিনি লোকতন্ত্রের জন্য ঐতিহাসিক স্থান বানাতে চেয়েছিলেন।

১৯২৭ সালে ব্ল্যাক হিলস পাহাড়ের উপর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। আর কয়েকবছর পর ১৯৪১ সালে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়। নিচে এই স্মৃতিসৌধটির নির্মাতা গুটজন বোরগ্লুম এর সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো – 

গুটজন বোরগ্লুম :- আমেরিকার একজন নামকরা ভাস্কর্য শিল্পী ছিলেন গুটজন। তার জন্ম হয় ১৮৬৭ সালের মার্চ মাসে এবং তার মৃত্যু হয় ১৯৪১ সালের মার্চ মাসে। মাউন্ট রাশমোর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। ভাস্কর্যশিল্পের পাশাপাশি তিনি দারুণ চিত্রশিল্পীও ছিলেন। গুটজনের পিতার নাম ছিল জেনস মুলার হাগার্ড বোরগ্লুম। জেনস এর দুই স্ত্রী ছিলেন। তার প্রথম স্ত্রী ছিল ইদা এবং দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল ক্রিস্টিনা মিক্কেলসেন বোরগ্লুম। সম্পর্কে তারা দুই বোন ছিল। ক্রিস্টিনা ছিলেন গুটজনের মা। 

গুটজনের তৈরি মাউন্ট রাশমোর যেরকম প্রসিদ্ধ হয়েছিল তার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি ভাস্কর্যের নিদর্শন রয়েছে। সেগুলি হল – স্টোন মাউন্টেন যেটি জর্জিয়াতে রয়েছে, এছাড়া আব্রাহাম লিংকনের মুর্তি এটি প্রদর্শিত হয় রুজভেল্টের হোয়াইট হাউসে, তার অন্যান্য ভাস্কর্য গুলির মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটন ডিসির ফিলিপ শেরিডানের মূর্তি, এছাড়াও তার প্রসিদ্ধ আরো যেসব স্থাপত্য ভাস্কর্য গুলো রয়েছে সেগুলি হল গেটিশবার্গের যুদ্ধের সময় উত্তর ক্যারোলিনিয়ান সৈন্যদের মূর্তি, অ্যাভিয়েটর যেটি ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত, নিউইয়র্ক এ অবস্থিত রবার্ট লুই স্টিভেনসন-র স্মৃতিসৌধ, ম্যানহ্যাটেনের ড্যানিয়েল বাটারফিল্ড এর মূর্তি ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে তার প্রচুর শিল্পকলার নিদর্শন তবে বহুল পরিচিত মাউন্ট রাশমোর এর সঙ্গেই তার নাম বেশি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। 

আরও পড়ুন :- শূন্যে ভাসমান ফুলের বাগান। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান। – New!

ডোয়েন রবিনসনের পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য এবং দেশীয় মহান ব্যক্তি বর্গের সম্মান প্রদর্শনের কারণে বানানো এই পাহাড়ী স্মৃতিসৌধটিতে আমেরিকার চারজন রাষ্ট্রপতি তথা জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, থিওডোর রুজভেল্ট, আর আব্রাহাম লিংকনের মূর্তি বানানো হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধটির প্রত্যেকটি মূর্তির উচ্চতা ৬০ ফুট। ১৯৪০ সালে ভৌগলিক নামের কথা বিচার করে রাজ্যের বোর্ড এই পাহাড় কে মাউন্ট রাশমোর নামে মান্যতা দিয়েছিল। এই পাহাড়ী এলাকা ১২৭৮ একর এর কাছাকাছি স্থান নিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ এটি প্রায় ৫ কিলোমিটার এর ক্ষেত্রফল নিয়ে অবস্থিত। ১৯২৭ থেকে ১৯৪১ এই নির্মাণকার্য চলে। অর্থাৎ ১৪ বছর সময় লাগে ভাস্কর্য নির্মাণ সম্পন্ন করতে। 

যে চারজন মহান রাষ্ট্রপতির মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল তাদের ব্যাপারে নিম্নে সংক্ষেপে কিছু বর্ণনা দেওয়া হল:

জর্জ ওয়াশিংটন :- জর্জ ওয়াশিংটনের জন্ম হয় ১৭৩২ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি। জর্জ ওয়াশিংটনের এর পিতার নাম ছিল আগাস্টিন ওয়াশিংটন এবং তার মাতার নাম ছিল মেরি বল ওয়াশিংটন। জর্জ ওয়াশিংটন ভার্জিনিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জর্জ ওয়াশিংটনের মা ছিল তার বাবা আগাস্টিন ওয়াশিংটনের দ্বিতীয় স্ত্রী। তার মোট ৯ জন ভাইবোন ছিল। তার অন্যান্য ভাই-বোনদের মতো তিনি বেশিদিন শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তবে তিনি ত্রিকোণমিতি, অংক এবং জমি জরিপ শিখেছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি আমিন এর কাজে নিযুক্ত হন। ভারত ও ফরাসি যুদ্ধের সময় তিনি সেনায় যোগ দেন। ঔপনিবেশিক সেনার প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। এরপর ১৭৭৫ সালে মার্কিন বিপ্লবের সময় তার পদোন্নতি হয় এবং তিনি আর্মির সর্বাধিনায়ক পদে আসীন হন। তার যুদ্ধ পরিচালনার নীতি দেখে তিনি প্রশংসিত হন। ১৭৮৭ সালের পর তিনি পর পর দু-বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি অবসর গ্রহণ করেন। আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন রক্ষা শান্তি স্থাপন ও সুষ্ঠু দেশ পরিচালনার জন্য জর্জ ওয়াশিংটন খ্যাতি লাভ করেন। ১৭৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

থমাস জেফারসন :- থমাস জেফারসন জন্মগ্রহণ করেন ১৭৪৩ সালের ১৩ ই এপ্রিল। তিনি ছিলেন আমেরিকার তৃতীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি আমেরিকার মহান চারজন রাষ্ট্রপতির একজন ছিলেন। তিনি সর্বদা চাইতেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। তার পিতার নাম ছিল পিটার জেফারসন।আর তার মাতা ছিলেন জেন রেনডোল্ফ জেফারসন। বংশ সূত্রে তিনি একজন ব্রিটিশ ছিলেন। তিনি ল্যাটিন, গ্রিক এবং ফরাসি ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। এছাড়াও তিনি গণিত এবং দর্শনের শিক্ষা গ্রহণ করেন। এর পরবর্তী সময়ে তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। এই সময়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে লড়তেন। তিনি আর্মির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর পরবর্তী সময়ে ১৭৮৭ তে তিনি গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৮০১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন। তিনি অবসরে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৬ সালের জুলাই মাসে ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

থিয়োডর রুজভেল্ট :- থিওডোর রুজভেল্ট এর জন্ম হয় ১৮৫৮ সালের অক্টোবর মাসে। রুজভেল্ট একজন প্রকৃতিপ্রেমী ব্যক্তি ছিলেন। ম্যানকিনলের মৃত্যুর পর আমেরিকার ২৬ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। মালিক শ্রেনীর এবং কর্মচারীদের বিবাদের সময় তার কর্ম গুন এবং নীতির কারণে তার মহৎ চরিত্র উজ্জল হয়ে ওঠে। শারীরিকভাবে তিনি ছিলেন বেশ শক্তিশালী। প্রাকৃতি এবং বন্য পশু পাখিদের জন্য প্রচুর জায়গা রক্ষা করেছিলেন তিনি। ১৯১৯ সালের ৬ ই জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আব্রাহাম লিংকন :- আব্রাহাম লিংকনের জন্ম হয় ১৮০৯ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি। তিনি ছিলেন আমেরিকার ১৬ তম রাষ্ট্রপতি। দাস প্রথার মত বর্বর প্রথা বিরোধী এই মহান ব্যক্তিটি ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল অবধি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি আইন নিয়েও পড়াশোনা করেন। আমেরিকাতে তিনি দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেন। আব্রাহাম একজন দারুণ বক্তাও ছিলেন। তার গেটিসবার্গ ভাষণ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। তিনি সকলের সামনে গণতন্ত্রের এক নিদারুন বর্ণনা দিয়েছিলেন। গৃহযুদ্ধের সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় বাহিনীতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই মহান রাষ্ট্রপতি ১৮৬৫ সালের ১৫ ই এপ্রিল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। 

আরও পড়ুন :- ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা সৃষ্টির ইতিহাস

আমেরিকার ইতিহাসের এই মহান ৪ জন ব্যক্তির মুর্তি অর্থাৎ মাউন্ট রাশমোর আজও তাদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান করছে। আর এই স্মৃতি স্মারকটির প্রায় সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৪১ সালে গুটজন বোরগ্লুম মারা যান। তার বাকি কাজ তার পুত্র লিংকন বোরগ্লুম শেষ করেন। এই সমস্ত কার্যটির জন্য প্রায় ৪০০ জন কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মাউন্ট রাশমোর গ্রানাইট পাথরে নির্মিত। তবে এই স্তম্ভটি প্রতি ১০ হাজার বছরে এক ইঞ্চি নষ্ট হয়। আমেরিকার ইতিহাস ও ভাস্কর্যের সেরা কয়েকটি নিদর্শন এর একটি মাউন্ট রাশমোর। 

Previous articleভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা সৃষ্টির ইতিহাস
Next articleস্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস। কিভাবে আমেরিকায় গড়ে উঠলো এই মূর্তি
আমরা Extra Gyaan এর সদস্যরা পেশাগতভাবে ব্লগিং এর সঙ্গে যুক্ত। আমরা ইন্টারনেট, প্রযুক্তি, নাসা, মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য, শিক্ষাগত দিক ও খেলাধুলার বিষয়ে নিবন্ধ লিখে থাকি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো বাংলা ভাষায় আপনাদের সামনে সেরা তথ্য তুলে ধরা।

Leave a Reply