কী হবে যদি পৃথিবীর আহ্নিক গতি হঠাৎই থেমে যায়

যদি আপনাকে বলা হয়েছে পৃথিবী ধীরে ধীরে তার গতি হারাচ্ছে। তাহলে আপনি কি বিশ্বাস করবেন? হ্যাঁ! কথাটি যুক্তিহীন মনে হলেও এটা কিন্তু একেবারেই সঠিক। গত ১০০ বছরে পৃথিবীতে দিনের পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। ব্যাপারটা ঠিক লক্ষনীয় না হলেও বিজ্ঞানীদের দাবি কিন্তু ঠিক এমনটাই। অনেকদিন ধরে গবেষণায় জানা গিয়েছে পূর্বে একশ বছরের তুলনায় বর্তমানের একদিনে অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা সময়ে ১.৭ মিলিসেকেন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় ধীরে ধীরে আরো অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে ভবিষ্যতে। যদিও তা দেখবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনটাই নেই আমাদের নেই। 

একদিন অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা সময় বৃদ্ধি হওয়ার অর্থ হলো পৃথিবী তার নিজের অক্ষ বরাবর যে ঘূর্ণন তার গতির হ্রাস পাওয়া। একদিনের সময় সামান্য বৃদ্ধি থেকেই আন্দাজ করা যায় পৃথিবীর গতি পরিবর্তন। কিন্তু কি হবে যদি কিছু সময়ের জন্য পৃথিবীর এই গতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। পৃথিবী যদি নিজের অক্ষে নিজেকে আবর্তন করা থামিয়ে দেয়। যদি এক সেকেন্ডের জন্যও এমন ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে তবে এই গ্রহের কোনো কিছুই আর আগের মত থাকবে না। যে গ্রহ থাকবে তাতে প্রাণের চিহ্ন টুকুও অবশিষ্ট থাকবে না আর।

আরও পড়ুন- কী হবে যদি পৃথিবীতে অক্সিজেনের পরিমাণ সাধারণের থেকে দ্বিগুণ মাত্রায় বেড়ে যায়।

আমরা ছোটবেলা থেকেই পাঠ্য বইতে পড়েছি পৃথিবীর ঘূর্ণন সম্পর্কে। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সাথে সাথেই নিজেকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে অনেক গতিতে। নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণন কে বলা হয় Diurnal Motion (আহ্নিক গতি)। এই আহ্নিক গতি পৃথিবীর এক এক জায়গায় এক এক রকম। তবে নিরক্ষরেখায়এই গতি সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর নিজের অক্ষ বরাবর গড়ে ঘন্টায় ১৬০০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরে চলেছে। এই গতি ০ ডিগ্রি অক্ষরেখা ১৬৭০ কিলোমিটার/ঘন্টা এবং ৩০ ডিগ্রি ও ৬০ ডিগ্রি অক্ষরেখায় যথাক্রমে ১৪৩৮ কিলোমিটার/ঘন্টা ও ৯৯০ কিলোমিটার/ঘন্টা। পৃথিবীর একেবারে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি অক্ষরেখায় এই গতি ০ কিলোমিটার/ঘন্টা গিয়ে দাঁড়ায়। এই গতির কারনে এই পৃথিবীতে জোয়ার ভাটা ও তাপমাত্রা পরিবর্তন দেখতে পাই আমরা।

এই গতিতে ঘুরে চলা পৃথিবীত থেমে গেলে কি হবে এই প্রশ্ন কিন্তু ছোটবেলা থেকে অনেকের মনে একবার হলেও জেগে উঠেছে। সে বিষয়ে এবার আলোচনা করা যাক। মনে করুন আপনি কোন গাড়ি চালাচ্ছেন বা কোন চলন্ত বাসে রয়েছেন, হঠাৎ করে যদি আপনি আপনার গাড়িতে ব্রেক করেন বা চলন্ত বাসে দাঁড়িয়ে যায়; আপনার গতি কিন্তু তৎক্ষণাৎ থেমে যাবে না। আপনি চলতেই থাকবেন, আপনি ছিটকে বেরিয়ে যাবেন চলন্ত গাড়ি থেকে। ঠিক এমনটাই হবে যদি পৃথিবীর ঘূর্ণন বন্ধ করে দেয়। পৃথিবীর সাথে সাথে আমরাও যেহেতু অনবরত ঘুরে চলেছি সে কারণে এতটা গতি আমরা বুঝতে পারি না; ঠিক চলন্ত বাসে দাঁড়িয়ে থাকার মতই। এবার হঠাৎই সেই গতি থেমে গেলে পৃথিবীর বুকে থাকা সেই সমস্ত জিনিস যেগুলো ঠিকমতো পৃথিবীর সাথে আটকে নেই যেমন মানুষ, যানবাহন, পশুপাখি সমস্তকিছুই পূর্বের দিকে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিবেগে উড়ে চলে যাবে নিমেষের মধ্যে। এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জোরে হওয়া ঝরে বয়ে চলা বাতাসের রেকর্ড ২৫৩ কিলোমিটার/ঘন্টা। এখানে সেই গতির আরও চার গুণ গতির কথা বলা হচ্ছে। একটি অ্যাটম বোমার সমতুল্য।

যদি পৃথিবীর গতি একেবারে শূন্য হয়ে যায় তবে এক মিনিটেরও কম সময়ে অনেক বড় সুনামি ও ভূপৃষ্ঠের নিচের মাটি কয়েক মাইল পর্যন্ত নিচে বসে যাবে। পৃথিবীর যত জল অর্থাৎ সমুদ্র, মহাসাগর থেকে শুরু করে নদী সব জল পূর্বের দিকে ছুটে যাবে ১০০০ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে। যেহেতু পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে মধ্যাকর্ষণ সবচেয়ে বেশি সে কারণে দুটি বৃহৎ মহাসাগর সৃষ্টি হবে দুই মেরুতে। সমস্ত স্থলভাগ চলে আসবে নিরক্ষরেখায় এবং একটি মহাদেশের সৃষ্টি করবে সেখানে। যেটি পুরো পৃথিবী কে বেষ্টন করে রাখবে।

প্রাণের অস্তিত্ব কথা বলতে গেলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিছু প্রজাতির যদিওবা বেঁচে থাকে পৃথিবীর ঘূর্ণন না থাকার কারণে তাও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেদিকে সূর্যের আলো পড়বে সেই দিকে অতিরিক্ত উত্তাপে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে সব কিছু। তার বিপরীত দিকে সূর্যালোক না থাকায় সেখানে শুরু হবে তুষার যুগ। কিন্তু এ সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করার জন্য পৃথিবীতে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে না। 

Leave a Reply