ভয়েজার মিশন কি। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় মহাকাশ মিশন

ভয়েজার মিশন কি: সৃষ্টির শুরু থেকেই মানবজাতির অজানাকে জানার কৌতুহল চলে আসছে। আর সেই কারণেই হয়তো আজ আমরা বা সমগ্র মানবজাতি এত উন্নত হয়েছি। সেরকমই মহাকাশ গবেষণায় আমার বা আপনার মত কৌতুহল অতীতের বিজ্ঞানীদের মধ্যেও ছিল। আজ তার পরিণাম হিসাবেই আমরা বইয়ের পাতায় মহাকাশের এত তথ্য পড়তে পারছি। ১৯৬০ এর দশকে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ বা সৌরমণ্ডলের সমস্ত গ্রহ গুলিকে দেখবার জন্য টেলিস্কোপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপের সাহায্যে সৌরমণ্ডলের সমস্ত গ্রহ গুলিকে পর্যবেক্ষণ করা হতো।

নাসার সবচেয়ে বড়ো মিশন

কিন্তু বিজ্ঞানীদের দরকার ছিল আরও নিখুঁত ও নির্ভুল তথ্য, যেটি পৃথিবী থেকে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিলনা। মহাকাশ গবেষক বিজ্ঞানীদের এমন একটি যানের দরকার ছিল যা প্রত্যেকটি গ্রহকে কাছ থেকে ছবি তুলতে পারবে। এই চিন্তা ধারাকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৬৪ সালে নাসার ‘জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির‘ গবেষক ‘গ্যারি ফ্ল্যান্ড্রো’ ‘গ্র্যান্ড ট্যুর প্রোগ্রাম‘ নামের একটি মিশন লঞ্চ করে। কিন্তু মিশনটি কোন কারণবশত ব্যর্থ হয়ে যায়। আসলে ১৯৭০ এর দশকটি মহাকাশ বিজ্ঞানীরা কেউই হাতছাড়া করতে চায়নি, কারণ ১৯৭০ দশকটিতে পৃথিবী সহ বাকি ৮টি গ্রহ একই সরলরেখায় চলে আসবে। যার ফলে পৃথিবী থেকে কোন মহাকাশযান খুব সহজে ও খুব দ্রুত সবকটি গ্রহের ছবি সংগ্রহ করতে পারবে।  

আরো পড়ুন- আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। ২০ বছর ধরে মানুষ এখানে বসবাস করছে  

ভয়েজার মিশন কি

সৌরমন্ডলে এরকম গ্রহ গুলির অবস্থান ১৭৫ বছরে একবারই আসে। এখন হয়তো বুঝতে পারছেন ৭০ দশকটি মহাকাশ গবেষণায় কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রথম মিশন ব্যর্থ হবার পর নাসা নিজে একটি মিশন ঘোষণা করেন যার নাম ভয়েজার(Voyager)ভয়েজার মিশনটিতে দুটি ভাগ ছিল, ১.ভয়েজার-১ ও অপরটি ২.ভয়েজার-২। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট ভয়েজার-২ লঞ্চ ও এর কিছুদিন পর ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ ভয়েজার-১ লঞ্চ করা হয়। দুটি মহাকাশযানেরই এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা ছিল না। সৌরমন্ডলে মিশনটিকে পুরো করার জন্যই ভয়েজারকে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এরই মাঝে একটি অবিশ্বাস্য চিন্তাধারা নিয়ে আসে জ্যোতিষ বিজ্ঞানী  ‘কার্ল সাগান‘। ১৯৭০ দশকে কার্ল সাগান  অন্যতম এক জ্যোতিষ বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি অন্য সবার মতোই বিশ্বাস করতেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানবজাতি ছাড়াও ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়ানদের অস্তিত্ব আছে, তার এই চিন্তাধারাকে মান্যতা দিয়ে নাসা একটি পরিকল্পনা করে। ভয়েজার-১ ও ২ সৌরমণ্ডলের একদম শেষ প্রান্তে যাবে এরপর মহাকাশযান দুটির আর কোনো কাজ থাকবে না।

সেই কারণে নাসা এই দুটি যানের সাথে পৃথিবী তথা মানব জাতির কিছু অস্তিত্ব পাঠিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করে। তবে এর পূর্বেও অর্থাৎ ১৯৭২ সালে নাসা ‘পাইওনিয়ার’ নামের একটি বিশেষ মিশন লঞ্চ করে যেখানে যানটির ভেতরে একটি স্টিলের প্লেটের উপরে মানুষের দুটি চিত্র ও কিছু সিগন্যাল দেওয়াছিল যানটির সম্পর্কে। কার্ল সাগান এই যান দুটিতে কিছু ভিন্ন চিন্তা ধারা নিয়ে আসে, সে স্টিলের প্লেটের সমান ওজনের দুটি ‘রেকর্ডিং ক্যাসেট‘ তৈরি করেন। যেখানে মানব ইতিহাসের সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছিল, সারা পৃথিবী থেকে ৫৫টি ভাষায় কিছু তথ্য, ১২০টির মতো চিত্র যার মধ্যে মানুষের জীবনযাপন, সূর্য, পৃথিবী, সমুদ্র, ঘরবাড়ি, গাছপালার ছবি দেওয়া আছে। এছাড়াও সমগ্র পৃথিবী থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংগীতকেউ সেখানে স্থান দেওয়া হয়েছে।  

দুটি ক্যাসেটই এই উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল যে, ভয়েজার-১ এবং ২ সৌরমণ্ডলের শেষ গ্রহটিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর অজানা পথে পা-দেবে, ফলে অদূর ভবিষ্যতে যদি কোন উন্নত সভ্যতা থেকে থাকে তবে তারা আমাদের পাঠানো বার্তাটিকে বিশ্লেষণ করতে পারবে। তারা জানতে পারবে এই ব্রম্মান্ডে পৃথিবী ও মানব জাতি বলে কিছু ছিল। ভবিষ্যতে যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় তবে, ভয়েজারে পাঠানো বার্তা অনন্ত কাল ধরে থেকে যাবে। যদি কোনদিন কোন এলিয়েন জগতে ভয়জার এসে পৌঁছায় তবে তারা আমাদের ঠিকানা জানতে পারবে। কার্ল সাগান মিশনটিতে আলাদা একরকমের রোমাঞ্চ জুরে দিয়েছিল যা ভয়েজার মিশনের মেম্বারদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। মহাকাশ গবেষকদের কোন গ্রহ সম্পর্কে জানার চেয়ে, কোন এলিয়েন সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার ছিল।  

১৯৭২ সালের পরের ৫ বছর ভয়েজার মিশনের সমস্ত ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, জ্যোতিষ বিজ্ঞানীর সফল প্রচেষ্টা ও অনন্তহীন গণিতের সূত্র একত্রিত করে ১৯৭৭ সালে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাশ অভিযান লঞ্চ করা হয়। ভয়েজার-২ আগে লঞ্চ হলেও ভয়েজার-১ এর গতি বেশি থাকায় সেটি ৫ মাস পর আগে এগিয়ে যায়। এর পরই শুরু হলো মহাকাশযান দুটির আসল মিশন।

“ভয়েজার মিশন কি। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় মহাকাশ মিশন”-এ 5-টি মন্তব্য

Leave a Reply